গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে অনেক নারী হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস কিংবা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যার সম্মুখীন হন। এক বা দুইবার পাতলা পায়খানা হওয়া সব সময় গুরুতর নয়, তবে এটি বারবার হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানা কেন হয়?
গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সব কারণই যে গুরুতর হবে, এমন নয়।
সাধারণ কিছু কারণ হলো:
- শরীরের হরমোনের পরিবর্তন
- নতুন ধরনের খাবার খাওয়া
- দূষিত খাবার বা পানি
- ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
- খাদ্যে অ্যালার্জি
- কিছু ওষুধ বা ভিটামিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া
কখনও কখনও মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কারণেও ডায়রিয়া হতে পারে।
তবে যদি পাতলা পায়খানা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, জ্বর থাকে, রক্ত যায় বা তীব্র পেটব্যথা হয়, তাহলে এটি সাধারণ সমস্যা নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

করণীয় ও ঘরোয়া যত্ন
গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে যাওয়া। তাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা এবং শরীরকে সুস্থ রাখা।
স্যালাইন ও পানি
গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানা হলে করণীয়-এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত তরল পান করা। ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে পানি ও খনিজ লবণ দ্রুত বের হয়ে যায়। ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
তাই:
- ওরাল স্যালাইন (ORS) পান করুন।
- পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
- ডাবের পানি খেতে পারেন।
- লেবুর শরবত (অতিরিক্ত চিনি ছাড়া) খেতে পারেন।
- পাতলা স্যুপ বা ভাতের মাড়ও উপকারী হতে পারে।
একবারে অনেক পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পান করুন। এতে বমি হওয়ার সম্ভাবনা কমে। যদি বারবার বমির কারণে কিছুই খেতে না পারেন, তাহলে হাসপাতালে গিয়ে শিরায় স্যালাইন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
সহজপাচ্য খাবার
ডায়রিয়ার সময় পেটকে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। তাই সহজে হজম হয় এমন খাবার বেছে নিন।
খেতে পারেন:
- নরম ভাত
- খিচুড়ি
- সেদ্ধ আলু
- কলা
- টোস্ট
- ওটস
- স্যুপ
- ভাতের মাড়
অল্প অল্প করে বারবার খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন:
- অতিরিক্ত ঝাল
- অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার
- ফাস্টফুড
- কোমল পানীয়
- অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
এসব খাবার ডায়রিয়া আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্রাম নেওয়া

অনেকেই মনে করেন শুধু ওষুধ খেলেই ডায়রিয়া ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শরীর যখন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন হয়।
তাই:
- পর্যাপ্ত ঘুমান।
- ভারী কাজ করবেন না।
- দীর্ঘ সময় রোদে থাকবেন না।
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
বিশ্রামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
এগুলোই হলো গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হলে করণীয় এবং গর্ভবতী অবস্থায় পাতলা পায়খানা হলে করণীয়-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ।
সতর্কতা ও বর্জনীয়
গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানা হলে অনেকেই পরিচিত কারও পরামর্শে বা ফার্মেসি থেকে নিজে ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন কয়েকদিন অপেক্ষা করলে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই দুটি অভ্যাসই মা ও গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানা হলে করণীয় জানার পাশাপাশি কী করা যাবে না, সেটিও জানা জরুরি।
ওষুধ নিজে খাবেন না
ইন্টারনেটে অনেকেই খোঁজ করেন গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানার ট্যাবলেট এর নাম। কিন্তু এটি এমন একটি বিষয় যেখানে নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া নিরাপদ নয়।
কারণ সব ধরনের ডায়রিয়ার ওষুধ গর্ভবতী নারীর জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু ওষুধ গর্ভের শিশুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, আবার কিছু ওষুধ নির্দিষ্ট অবস্থায়ই ব্যবহার করা যায়।
ডায়রিয়ার কারণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও হতে পারে। তাই কারণ না জেনে ওষুধ খেলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে।
কেন নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না?
- গর্ভের শিশুর ক্ষতির ঝুঁকি থাকতে পারে।
- ভুল ওষুধ রোগকে আরও জটিল করতে পারে।
- সংক্রমণ থাকলে সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে।
- কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
যদি চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করেন, তিনিই আপনার গর্ভাবস্থার সময়, শারীরিক অবস্থা এবং রোগের কারণ অনুযায়ী নিরাপদ ওষুধ নির্বাচন করবেন। তাই গর্ভাবস্থায় পাতলা পায়খানার ট্যাবলেট এর নাম জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা।
দুধ ও ফাইবার সীমিত করুন
ডায়রিয়ার সময় কিছু খাবার সাময়িকভাবে কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষ করে:
- অতিরিক্ত দুধ
- পনির
- আইসক্রিম
- অতিরিক্ত কাঁচা শাকসবজি
- অতিরিক্ত আঁশযুক্ত খাবার
এসব খাবার অনেকের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো গর্ভাবস্থায় এসব খাবার বন্ধ রাখতে হবে। ডায়রিয়া ভালো হয়ে গেলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী আবার স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় ফিরে যেতে পারবেন।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলা ভালো
- রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার
- কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ মাংস
- অপরিষ্কার পানি
- মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার
- অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত খাবার
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাবার গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণজনিত ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
কখন চিকিৎসক দেখাবেন?
এক বা দুইবার পাতলা পায়খানা হলে অনেক সময় ঘরোয়া যত্নেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান যদি:
- ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বারবার পাতলা পায়খানা হয়।
- খুব বেশি দুর্বল লাগে।
- মুখ শুকিয়ে যায়।
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়।
- তীব্র পেটব্যথা হয়।
- জ্বর থাকে।
- পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা কালো মল আসে।
- বারবার বমি হয়।
- কিছুই খেতে বা পান করতে না পারেন।
- মাথা ঘোরে বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লাগে।
- গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে যায়।
- জরায়ুতে অস্বাভাবিক সংকোচন বা ব্যথা শুরু হয়।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা বা সংক্রমণ হতে পারে, যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ডায়রিয়ার সঙ্গে পেটব্যথা বা নিয়মিত সংকোচন শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এটি অকাল প্রসবের লক্ষণও হতে পারে।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতি হলে জরুরি বিভাগে যাওয়া উচিত:
- একেবারেই পানি ধরে রাখতে না পারা।
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- শ্বাসকষ্ট হওয়া।
- তীব্র পানিশূন্যতা।
- উচ্চ জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া।
- রক্তযুক্ত ডায়রিয়া।
- গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া।
এসব অবস্থায় বাড়িতে বসে অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। মনে রাখবেন, গর্ভবতী মায়ের পাতলা পায়খানা হলে করণীয় শুধু ঘরোয়া যত্ন নেওয়া নয়; প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, তত দ্রুত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
কীভাবে ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমাবেন?
গর্ভাবস্থায় কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে ডায়রিয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পান করুন
ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হলো দূষিত খাবার ও পানি। তাই:
- সব সময় বিশুদ্ধ বা ফুটানো পানি পান করুন।
- বাইরে খোলা খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
- ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খান।
- খাবার ভালোভাবে রান্না হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।
হাত পরিষ্কার রাখুন
খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন। এতে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন
প্রতিদিন সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং অতিরিক্ত তেল, মসলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো-আপ করুন
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ করলে অনেক সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই শনাক্ত করা যায়। আপনার যদি আগে থেকেই হজমের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকে, তাহলে চিকিৎসককে অবশ্যই জানান।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও যোগাযোগ
গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানা বা অন্য যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আপনি যোগাযোগ করতে পারেন হারভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার-এ, যেখানে পরামর্শ প্রদান করেন বাংলাদেশের প্রথম এবং ২৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ মুশতাক আহমেদ।
আজই যোগাযোগ করুন
মোবাইল:
- ০১৮১৭-১৪৬৬৪০
- ০১৭০৬৩২০০৩৯
প্রধান কার্যালয়
মান্নান হাইটস, সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-৬, হাউস-১০০, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা-১২২১।
মিরপুর-১০ চেম্বার
চতুর্থ তলা, বাসা-০১, রোড-০৭, ব্লক-এ, সেকশন-১০, মিরপুর-১০, ঢাকা-১২১৬।
সিলেট চেম্বার
থাইরোকেয়ার লেভেল-৩, আল মাদানী টাওয়ার, আজাদি ৬১-৬২, নয়া সড়ক, মিরবক্স টুলা, সিলেট। সিলেট উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালের বিপরীতে।
দিনাজপুর চেম্বার
ইউনিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিকেল মোড় (হাসপাতাল ২ নম্বর গেটের সামনে), দিনাজপুর সদর-৫২০০।