আইভিএফ পদ্ধতি কি? আইভিএফ কিভাবে করে এবং কেন করা হয়?

অনেক দম্পতি দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরও স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণ করতে না পারলে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান। এর মধ্যে আইভিএফ (IVF) বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি আধুনিক বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা পদ্ধতি।

সহজভাবে বলতে গেলে, আইভিএফ পদ্ধতি কি? এর উত্তর হলো, IVF বা In Vitro Fertilization এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে নারীর ডিম্বাণু শরীর থেকে সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পুরুষের শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক করানো হয়। নিষেকের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ভ্রূণ কিছুদিন ল্যাবরেটরিতে পর্যবেক্ষণে রাখার পর উপযুক্ত ভ্রূণ নারীর জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।

তাহলে আইভিএফ কিভাবে করে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বোঝা প্রয়োজন। সাধারণত IVF চিকিৎসার মধ্যে ডিম্বাণু তৈরি ও পরিপক্ব করা, ডিম সংগ্রহ, নিষেক, ভ্রূণ সংস্কৃতি এবং ভ্রূণ স্থানান্তরের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ থাকে।

আইভিএফ পদ্ধতির প্রধান ধাপসমূহ

IVF একটি একদিনের চিকিৎসা নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স, ডিম্বাণুর মজুত, শুক্রাণুর মান এবং চিকিৎসার পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে পুরো প্রক্রিয়ার সময়কাল ভিন্ন হতে পারে।

সাধারণভাবে আইভিএফ কিভাবে করে তা নিচের ধাপগুলো থেকে সহজেই বোঝা যায়।

১. ওভারিয়ান স্টিমুলেশন

ওভারিয়ান স্টিমুলেশন

প্রথম ধাপে নারীর ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের হরমোনাল ওষুধ দেওয়া হয়। স্বাভাবিক মাসিক চক্রে সাধারণত একটি ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়। কিন্তু IVF-এর ক্ষেত্রে একাধিক পরিপক্ব ডিম্বাণু পাওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এই সময় চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে ডিম্বাশয়ের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। ডিম্বাণুগুলো কতটা বড় হচ্ছে এবং কখন সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত হবে, তা চিকিৎসক এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে ফলোআপ করা গুরুত্বপূর্ণ।

২. ডিম সংগ্রহ

ডিম সংগ্রহ

ডিম্বাণুগুলো পর্যাপ্ত পরিপক্ব হলে পরবর্তী ধাপে ডিম সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে Egg Retrieval বা Oocyte Retrieval বলা হয়।

সাধারণত আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের ফলিকলগুলো শনাক্ত করে একটি বিশেষ সূক্ষ্ম সূঁচের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। প্রক্রিয়াটি সাধারণত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করা হয় এবং রোগীর আরাম ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

সংগ্রহ করা ডিম্বাণুগুলো এরপর IVF ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

৩. নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন

ডিম্বাণু সংগ্রহের পর ল্যাবরেটরিতে পুরুষের শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর নিষেক করানো হয়। এই ধাপটিই IVF-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাধারণ IVF-এ নির্দিষ্ট পরিবেশে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে একসঙ্গে রাখা হয়, যাতে শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতিশীলতা কম থাকলে কিংবা অন্য কোনো কারণে প্রয়োজন হলে ICSI (Intracytoplasmic Sperm Injection) পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে। ICSI-এর ক্ষেত্রে একটি নির্বাচিত শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।

নিষেক সফল হলে ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ শুরু হয়।

৪. ভ্রূণ সংস্কৃতি

নিষেকের পর তৈরি হওয়া ভ্রূণকে বিশেষ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে IVF ল্যাবরেটরিতে রাখা হয়। এই সময় ভ্রূণের বৃদ্ধি ও বিকাশ বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণ করেন।

ভ্রূণ কয়েকদিন ধরে ল্যাবরেটরিতে বিকশিত হতে পারে। এই সময় ভ্রূণের বিভাজন এবং বিকাশের বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কোন ভ্রূণ স্থানান্তরের জন্য উপযুক্ত হতে পারে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্রূণের বিকাশের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা আলাদা হওয়ায় ভ্রূণ নির্বাচন ও স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত চিকিৎসক এবং এমব্রায়োলজি টিম রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ে থাকেন।

৫. ভ্রূণ স্থানান্তর (Embryo Transfer)

ভ্রূণ স্থানান্তর

IVF-এর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো Embryo Transfer বা ভ্রূণ স্থানান্তর।

এই ধাপে নির্বাচিত ভ্রূণ একটি পাতলা ও নমনীয় ক্যাথেটারের মাধ্যমে নারীর জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়। সাধারণত এটি একটি তুলনামূলকভাবে সহজ চিকিৎসা প্রক্রিয়া।

ভ্রূণ জরায়ুতে স্থানান্তরের পর সেটি জরায়ুর আবরণে সংযুক্ত হয়ে গর্ভধারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর গর্ভধারণ হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়।

এখানে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, ভ্রূণ স্থানান্তর করা মানেই গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়া নয়। IVF-এর সফলতা বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণমান, ভ্রূণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, জরায়ুর অবস্থা এবং অন্যান্য অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।

কেন আইভিএফ করা হয়?

অনেকেই জানতে চান, ivf কি এবং কোন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক IVF করার পরামর্শ দিতে পারেন।

IVF বিভিন্ন ধরনের বন্ধ্যাত্ব সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। তবে প্রত্যেক রোগীর জন্য IVF প্রয়োজন হবে এমন নয়। রোগীর বয়স, বন্ধ্যাত্বের কারণ, পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

নারীদের ফ্যালপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে

নারীর ফ্যালপিয়ান টিউব ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুইটি টিউবই বন্ধ বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাভাবিকভাবে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই ধরনের ক্ষেত্রে IVF একটি চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে। কারণ IVF-এর সময় ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর নিষেক শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে করানো হয় এবং পরবর্তীতে তৈরি ভ্রূণ জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।

পুরুষের শুক্রাণুর স্বল্পতা বা গুণগত মান কম থাকলে

পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, শুক্রাণুর গতিশীলতা কম থাকা বা শুক্রাণুর অন্যান্য গুণগত সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে।

সমস্যার ধরন ও মাত্রার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে IVF-এর সঙ্গে ICSI ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে।

ডিম্বস্ফোটনে (Ovulation) সমস্যা থাকলে

নারীর ডিম্বাশয় থেকে নিয়মিত ডিম্বাণু বের না হলে বা ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা থাকলে গর্ভধারণে অসুবিধা হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে প্রথমে চিকিৎসক কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারেন। অন্যান্য চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া গেলে রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী IVF বিবেচনা করা হতে পারে।

কারণ অজানা বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে

কিছু দম্পতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরও বন্ধ্যাত্বের নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। একে Unexplained Infertility বা কারণ অজানা বন্ধ্যাত্ব বলা হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতেও রোগীর বয়স, কতদিন ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, পূর্বের চিকিৎসা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক IVF-এর মতো সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারেন।

IVF কি সবার জন্য একইভাবে কাজ করে?

ivf কি বা IVF-এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার পাশাপাশি একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রত্যেক রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা একই নয়।

কারও ক্ষেত্রে কম সংখ্যক ডিম্বাণু পাওয়া যেতে পারে, কারও ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে জরায়ু বা অন্যান্য শারীরিক বিষয় বিবেচনা করতে হতে পারে। তাই একজনের জন্য যে চিকিৎসা পরিকল্পনা উপযুক্ত, অন্যজনের জন্য সেটি একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

IVF শুরু করার আগে সাধারণত রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসার ইতিহাস এবং সামগ্রিক শারীরিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী ও তার সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন।

IVF চিকিৎসার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

IVF একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রক্রিয়া। তাই ইন্টারনেট বা অন্য কারও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে নিজে থেকে চিকিৎসা শুরু না করে বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বন্ধ্যাত্বের সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন এবং রোগীর বয়স, স্বাস্থ্য, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর অবস্থা, পূর্বের চিকিৎসা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।

আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও সফল না হন, তাহলে দেরি না করে একজন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

আপনি যদি IVF চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান বা আপনার জন্য IVF প্রয়োজন কি না তা জানতে চান, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

হারভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার-এ আপনি বাংলাদেশের প্রথম এবং ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ মুশতাক আহমেদ-এর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন।

IVF, IUI, বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয় এবং সহায়ক প্রজনন চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে আজই যোগাযোগ করুন।

আজই যোগাযোগ করুন

মোবাইল:
০১৮১৭-১৪৬৬৪০
০১৭০৬৩২০০৩৯

ঠিকানা

প্রধান কার্যালয়:
ব্লক-এ, বাসা-০৯, রোড নং-০৬, মিরপুর-১০, ঢাকা-১২১৬
(মেট্রোরেলের পিলার নং ২৩৩ এবং ইনডোর স্টেডিয়ামের বিপরীতে)

সিলেট চেম্বার:
থাইরোকেয়ার লেভেল-৩, আল মাদানী টাওয়ার, আজাদি ৬১-৬২, নয়া সড়ক, মিরবক্স টুলা, সিলেট, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালের বিপরীতে।

দিনাজপুর চেম্বার:
ইউনিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিকেল মোড়
(হাসপাতাল ২ নম্বর গেটের সামনে), দিনাজপুর সদর-৫২০০।

Scroll to Top