সাদা স্রাব (White Vaginal Discharge) নারীদের একটি খুবই সাধারণ শারীরবৃত্তীয় বিষয়। অনেক নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এটি অনুভব করেন। তবে অনেকেই অযথা ভয় পেয়ে যান এবং মনে করেন, সাদা স্রাব মানেই বড় কোনো রোগ। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে সাদা স্রাব সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং এটি নারীর প্রজনন অঙ্গকে পরিষ্কার ও সংক্রমণমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সাদা স্রাব সংক্রমণ, হরমোনের পরিবর্তন বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
কখন সাদা স্রাব স্বাভাবিক?
নিচের পরিস্থিতিতে সাদা স্রাব হওয়া সাধারণত স্বাভাবিক:
- মাসিক শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে
- মাসিক শেষ হওয়ার পরে
- ডিম্বস্ফোটনের (Ovulation) সময়
- বয়ঃসন্ধিকালে
- গর্ভাবস্থায়
- যৌন উত্তেজনার সময়
যদি স্রাবের সঙ্গে দুর্গন্ধ, চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা ব্যথা না থাকে, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ।

সাদা স্রাব কেন হয়?
এটি নারীদের সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্নগুলোর একটি।
আসলে সাদা স্রাবের কারণ দুই ধরনের হতে পারে:
- স্বাভাবিক (Physiological)
- অস্বাভাবিক (Pathological)
চলুন একে একে জেনে নেওয়া যাক।
স্বাভাবিক কারণ
- ডিম্বস্ফোটন (Ovulation): মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়ে ডিম্বস্ফোটনের সময় অনেক নারীর সাদা বা স্বচ্ছ স্রাব বেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং শরীরের হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে হয়।
- মাসিকের আগে ও পরে: মাসিক শুরু হওয়ার আগে এবং শেষ হওয়ার পরে অনেকের সাদা স্রাব দেখা যায়। এটি সাধারণত হরমোনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফল।
- বয়ঃসন্ধিকাল: কৈশোরে প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার আগে অনেক মেয়ের সাদা স্রাব হতে পারে। এটি শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন বাড়ার কারণে হয় এবং সাধারণত চিন্তার কোনো কারণ নয়।
- গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সাদা স্রাবের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। তবে যদি দুর্গন্ধ, সবুজ বা হলুদ রঙ, ব্যথা বা রক্তপাত থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- যৌন উত্তেজনা: যৌন উত্তেজনার সময় যোনিতে স্বাভাবিকভাবেই তরল নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং কোনো রোগ নয়।
অস্বাভাবিক কারণ
সব সাদা স্রাব স্বাভাবিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি সংক্রমণ বা অন্য কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
- ফাঙ্গাল সংক্রমণ (Yeast Infection): এটি সাদা স্রাবের অন্যতম সাধারণ কারণ। লক্ষণগুলো হতে পারে: দইয়ের মতো ঘন সাদা স্রাব, তীব্র চুলকানি, জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব
- ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস: যোনিতে স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে এই সমস্যা হতে পারে। লক্ষণ: পাতলা সাদা বা ধূসর স্রাব, মাছের মতো দুর্গন্ধ, সহবাসের পরে দুর্গন্ধ বেড়ে যাওয়া
- যৌনবাহিত সংক্রমণ (STI): কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণের কারণেও অস্বাভাবিক সাদা স্রাব হতে পারে। এর সঙ্গে থাকতে পারে: তলপেটে ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, দুর্গন্ধ, জ্বর
- সার্ভিক্সের সংক্রমণ: জরায়ুমুখে সংক্রমণ হলে অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- পেলভিক ইনফেকশন: সংক্রমণ জরায়ু বা ডিম্বনালিতে ছড়িয়ে পড়লে সাদা স্রাবের পাশাপাশি, তীব্র ব্যথা, জ্বর, দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
- হরমোনের পরিবর্তন: হরমোনের ওঠানামার কারণেও অনেক সময় সাদা স্রাবের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়?
অনেকেই মনে করেন, শুধুমাত্র বিবাহিত নারীদের সাদা স্রাব হয়। এটি একটি ভুল ধারণা। অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়, এরও বেশ কয়েকটি স্বাভাবিক কারণ রয়েছে।
- বয়ঃসন্ধিকাল: মেয়েদের শরীরে যখন হরমোনের পরিবর্তন শুরু হয়, তখন সাদা স্রাব হওয়া খুবই সাধারণ বিষয়।
- হরমোনের ওঠানামা: মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সাদা স্রাব হতে পারে।
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে ফাঙ্গাল বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হতে পারে, যা অস্বাভাবিক সাদা স্রাবের কারণ হতে পারে।
- ফাঙ্গাল সংক্রমণ: আঁটসাঁট পোশাক, দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকা বা অতিরিক্ত আর্দ্র পরিবেশে থাকার কারণে ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে।
- ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে বারবার ফাঙ্গাল সংক্রমণ হতে পারে, যার ফলে সাদা স্রাব দেখা দিতে পারে।
কখন অবিবাহিত মেয়েদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
- দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব
- সবুজ বা হলুদ রঙের স্রাব
- তীব্র চুলকানি
- প্রস্রাবে ব্যথা
- জ্বর
- তলপেটে ব্যথা
- রক্তমিশ্রিত স্রাব
এ ধরনের উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সাদা স্রাবের বিভিন্ন ধরন
পাতলা সাদা বা স্বচ্ছ স্রাব
এ ধরনের স্রাব সাধারণত স্বাভাবিক।
এটি দেখা যেতে পারে
- ডিম্বস্ফোটনের সময়
- মাসিকের আগে বা পরে
- যৌন উত্তেজনার সময়
- গর্ভাবস্থায়
যদি এর সঙ্গে কোনো দুর্গন্ধ, চুলকানি বা ব্যথা না থাকে, তাহলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
ঘন সাদা স্রাব
ঘন সাদা স্রাব কখনও স্বাভাবিক হতে পারে, আবার কখনও সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। যদি এর সঙ্গে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকে, তাহলে এটি ফাঙ্গাল সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
দইয়ের মতো সাদা স্রাব
দইয়ের মতো ঘন সাদা স্রাব সাধারণত ইস্ট (Yeast) সংক্রমণের একটি সাধারণ লক্ষণ।
এর সঙ্গে থাকতে পারে:
- তীব্র চুলকানি
- যোনিতে জ্বালাপোড়া
- লালভাব
- সহবাসের সময় অস্বস্তি
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হলুদ বা সবুজাভ স্রাব
হলুদ, সবুজ বা ঘন সবুজ স্রাব সাধারণত স্বাভাবিক নয়। এটি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ বা যৌনবাহিত সংক্রমণের (STI) লক্ষণ হতে পারে।
দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব
যদি সাদা স্রাবের সঙ্গে মাছের মতো বা তীব্র দুর্গন্ধ থাকে, তাহলে এটি ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা অন্য কোনো সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা অবহেলা করা উচিত নয়।
রক্তমিশ্রিত স্রাব
মাসিকের সময় ছাড়া অন্য সময় রক্তমিশ্রিত স্রাব হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি এটি বারবার হয়, তাহলে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
কোন ধরনের সাদা স্রাব স্বাভাবিক?
অনেক নারী বুঝতে পারেন না, কোন স্রাব স্বাভাবিক আর কোনটি নয়।
সাধারণত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে সাদা স্রাব স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়—
- স্বচ্ছ বা দুধের মতো সাদা রং
- দুর্গন্ধ না থাকা
- চুলকানি বা জ্বালাপোড়া না থাকা
- মাসিক চক্র অনুযায়ী পরিমাণের পরিবর্তন হওয়া
- তীব্র ব্যথা না থাকা
এ ধরনের স্রাব নারীর স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ার অংশ।
কোন ধরনের সাদা স্রাব বিপদের লক্ষণ?
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- তীব্র দুর্গন্ধ
- সবুজ, হলুদ বা ধূসর রঙের স্রাব
- যোনিতে চুলকানি
- জ্বালাপোড়া
- প্রস্রাবে ব্যথা
- সহবাসে ব্যথা
- তলপেটে ব্যথা
- জ্বর
- রক্তমিশ্রিত স্রাব
এসব লক্ষণ সংক্রমণ বা অন্য কোনো রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।
সাদা স্রাব হলে কি ক্ষতি হয়?
এর উত্তর হলো, সব সময় নয়। স্বাভাবিক সাদা স্রাব শরীরের জন্য উপকারী এবং এটি কোনো রোগ নয়। তবে যদি সাদা স্রাবের কারণ সংক্রমণ হয় এবং চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ জরায়ু, ডিম্বনালি বা পেলভিক অঙ্গে ছড়িয়ে যেতে পারে। দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
অনেক সময় সাদা স্রাব স্বাভাবিক হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি সংক্রমণ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- সাদা স্রাবের সঙ্গে তীব্র দুর্গন্ধ থাকলে।
- স্রাবের রং হলুদ, সবুজ, ধূসর বা রক্তমিশ্রিত হলে।
- যোনিতে তীব্র চুলকানি বা জ্বালাপোড়া হলে।
- প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হলে।
- সহবাসের সময় ব্যথা অনুভূত হলে।
- তলপেটে তীব্র ব্যথা বা জ্বর থাকলে।
- গর্ভাবস্থায় অস্বাভাবিক সাদা স্রাব হলে।
- দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলেও ভালো না হলে।
সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয় করে কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
সাদা স্রাব কেন হয়, সাদাস্রাব কেন হয়, অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয় অথবা সাদা স্রাব হলে কি ক্ষতি হয়, এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারণ সাদা স্রাবের কারণ সব নারীর ক্ষেত্রে এক নয়।
তাই বারবার সাদা স্রাব হওয়া, দুর্গন্ধ, চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে একজন অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ ও প্রজননস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
আপনি চাইলে হারভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ার-এ প্রজননস্বাস্থ্য ও স্ত্রী রোগ সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।
আজই যোগাযোগ করুন
মোবাইল
- ০১৮১৭-১৪৬৬৪০
- ০১৭০৬৩২০০৩৯
প্রধান কার্যালয়
মান্নান হাইটস, সেকশন-১২, ব্লক-বি, রোড-৬, হাউস-১০০, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা-১২২১
মিরপুর-১০ চেম্বার
চতুর্থ তলা, বাসা-০১, রোড-০৭, ব্লক-এ, সেকশন-১০, মিরপুর-১০, ঢাকা-১২১৬
সিলেট চেম্বার
থাইরোকেয়ার, লেভেল-৩, আল মাদানী টাওয়ার, আজাদি ৬১-৬২, নয়া সড়ক, মিরবক্স টুলা, সিলেট (সিলেট উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালের বিপরীতে)
দিনাজপুর চেম্বার
ইউনিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিকেল মোড় (হাসপাতাল ২ নম্বর গেটের সামনে), দিনাজপুর সদর-৫২০০
